মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব নিয়ে উক্তি—এই দুটি শব্দে মিশে আছে পৃথিবীর সমস্ত মমতা, নিরাপত্তা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। একটি শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয়, তখন তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হন তার মা-বাবা। শৈশব থেকে কৈশোর, আর কৈশোর থেকে যৌবন—জীবনের প্রতিটি বাঁকে তাঁরা ছায়ার মতো আমাদের আগলে রাখেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আমরা যখন বড় হই, অনেক সময় জাগতিক ব্যস্ততায় সেই মানুষগুলোর কথা ভুলে যাই যারা আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন কেবল একটি সামাজিক বা ধর্মীয় নিয়ম নয়, এটি আমাদের নৈতিকতার পরিচয়।
সন্তানের জীবনে মা-বাবার গুরুত্ব
মা-বাবার অবদানের কথা কোনো শব্দ বা বাক্যে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একজন মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে অশেষ কষ্টে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান। আর বাবা নিজের জীবনের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। ইসলাম ধর্মসহ পৃথিবীর প্রতিটি ধর্ম ও দর্শনে মা-বাবার সম্মানকে স্রষ্টার ইবাদতের পর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করো।” ঠিক একইভাবে হিন্দুধর্মে বলা হয়েছে, “মাতৃদেব ভব, পিতৃদেব ভব।” অর্থাৎ মাতাকে দেবতার ন্যায় এবং পিতাকে দেবতার ন্যায় শ্রদ্ধা করো।
মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব নিয়ে মহান ব্যক্তিদের অনুপ্রেরণামূলক বাণী

১. “মায়ের আশীর্বাদ পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের চেয়েও দামী।”
২. “বাবা হলেন সেই মানুষ, যিনি নিজের জীবন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।”
৩. “পৃথিবীর কোনো শিক্ষকই মায়ের সমান শিক্ষা দিতে পারেন না।”
৪. “বাবার ভালোবাসা পাহাড়ের মতো অটল, যা বাহির থেকে দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়।”
৫. “মায়ের কান্না পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু, যা সহ্য করার শক্তি কারও নেই।”
৬. “যার ঘরে মা নেই, তার ঘর যেন আলোহীন প্রদীপ।”
৭. “বাবার ঘাম সন্তানের জীবনের পাথেয়।”
৮. “মায়ের হাসি স্বর্গের সুখের আভাস দেয়।”
৯. “মা-বাবা ছাড়া জীবন হলো দিশাহীন নৌকার মতো।”
১০. “সন্তানের জন্য মা-বাবাই হলো প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল।”
ইসলামী মনীষী ও খলিফাদের বাণী
১১. হযরত আলী (রা.) বলেছেন: “মা-বাবার সেবা করো, তাহলে তোমার সন্তানরাও তোমার সেবা করবে।”
১২. “পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।” (আল-হাদিস)
১৩. “তোমার মায়ের সেবা করো, এরপর তোমার মায়ের, এরপর তোমার মায়ের এবং সবশেষে তোমার বাবার।” (সহীহ বুখারী)
১৪. “বৃদ্ধ মা-বাবাকে যারা অবহেলা করে, তারা জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।”
১৫. ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেন: “মা-বাবার সাথে তর্ক করা মানে নিজের সাফল্যের দরজা বন্ধ করে দেওয়া।”
১৬. “পিতার বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো, কারণ তা আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।”
১৭. “মা হলেন মমতা আর ক্ষমার আধার।”
১৮. “পিতার সম্মান বজায় রাখা সন্তানের ঈমানি দায়িত্ব।”
১৯. “মায়ের এক ফোঁটা চোখের জল মোছানো শত বছরের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।”
২০. “যে সন্তান তার মায়ের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলে, তার নেক আমল ধ্বংস হয়ে যায়।”
বিশ্ববিখ্যাত মনীষীদের বাণী
২১. আব্রাহাম লিংকন: “আমি যা হয়েছি বা যা হওয়ার আশা করি, তার সবকিছুই আমার দেবতুল্য মায়ের জন্য।”
২২. উইলিয়াম শেক্সপিয়ার: “একজন বুদ্ধিমান বাবা তার সন্তানকে জানেন।”
২৩. অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস: “মায়ের কোল হলো পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ বিছানা।”
২৪. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: “মা হলেন বিধাতার আশীর্বাদ যা প্রতিটি ঘরে বিচরণ করে।”
২৫. মহাত্মা গান্ধী: “আমার মায়ের কাছ থেকেই আমি অহিংসা এবং সত্যের শিক্ষা পেয়েছি।”
২৬. আলবার্ট আইনস্টাইন: “আমার মা ছিলেন শ্রেষ্ঠ অনুপ্রেরণা, যিনি আমাকে ভাবতে শিখিয়েছিলেন।”
২৭. লিও টলস্টয়: “সুখী পরিবারের মূলে থাকে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা।”
২৮. ভিক্টর হুগো: “মায়ের বাহু হলো দয়া আর কোমলতা দিয়ে তৈরি।”
২৯. চার্লস ডিকেন্স: “মায়ের ভালোবাসার কাছে কোনো কিছুই তুলনা হয় না।”
৩০. থমাস এডিসন: “আমার মা আমাকে গড়েছিলেন। তিনি আমাকে বিশ্বাস করতেন।”
মা-বাবার ত্যাগের ওপর বাণী
৩১. “মা নিজের পেটে পাথর বেঁধে সন্তানকে পেট ভরে খাওয়ান।”
৩২. “বাবা নিজের তালি দেওয়া জামা পরে সন্তানকে নতুন পোশাক কিনে দেন।”
৩৩. “মা হলেন পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক, যেখানে সব দুঃখ জমা রাখা যায় এবং বিনিময়ে শুধু ভালোবাসা পাওয়া যায়।”
৩৪. “পিতার হাত ধরা মানে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়ে থাকা।”
৩৫. “মায়ের মমতা হলো মহাসমুদ্রের মতো যার কোনো কুল নেই।”
৩৬. “সন্তান বড় হওয়ার সাথে সাথে মা-বাবার ত্যাগও বড় হতে থাকে।”
৩৭. “মা-বাবা হলেন সেই মোমবাতি, যারা নিজেরা পুড়ে সন্তানকে আলো দেন।”
৩৮. “পৃথিবীতে স্বার্থহীন ভালোবাসা কেবল মা-বাবার কাছেই পাওয়া যায়।”
৩৯. “বাবার শাসনের পেছনে থাকে সন্তানের জন্য অফুরন্ত মমতা।”
৪০. “মায়ের প্রার্থনা বুলেটের চেয়েও দ্রুত কাজ করে।”
সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে উক্তি
৪১. “মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো মানে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।”
৪২. “যাদের মা-বাবা জীবিত আছে, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ।”
৪৩. “মা-বাবার চোখের পানি যে সন্তান ঝরায়, সে কখনো জীবনে সুখী হতে পারে না।”
৪৪. “তাদের সাথে বিনয়ের সাথে কথা বলো, যেভাবে তারা তোমার সাথে ছোটবেলায় বলতেন।”
৪৫. “মা-বাবার ছোট ছোট ইচ্ছা পূরণ করাই সন্তানের বড় সার্থকতা।”
৪৬. “তাদের অসুস্থতায় পাশে থাকা হলো শ্রেষ্ঠ ইবাদত।”
৪৭. “মা-বাবার সম্মান রক্ষা করা সন্তানের প্রধান ব্রত হওয়া উচিত।”
৪৮. “তাদের কথা ধৈর্য ধরে শোনা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।”
৪৯. “বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবাকে সঙ্গ দেওয়া মানে তাদের শ্রেষ্ঠ উপহার দেওয়া।”
৫০. “মা-বাবার মুখে হাসি দেখা মানেই পৃথিবীর সব যুদ্ধ জয় করা।”
মনস্তাত্ত্বিক ও অনুপ্রেরণামূলক বাণী
৫১. “মায়ের সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত অমূল্য স্মৃতি।”
৫২. “বাবার জুতো যখন সন্তানের পায়ে হয়, তখন সন্তান বড় হয় না, বরং বাবার দায়িত্ব তার কাঁধে আসে।”
৫৩. “পৃথিবী তোমাকে ছুড়ে ফেলে দিলেও মা-বাবা তোমাকে কুড়িয়ে নেবেন।”
৫৪. “মায়ের স্পর্শে সব ব্যথা মুছে যায়।”
৫৫. “বাবার ছায়া মাথার ওপর থাকলে তপ্ত রোদেও ভয় নেই।”
৫৬. “মা হলেন জীবনের কম্পাস, যিনি সঠিক পথ দেখান।”
৫৭. “বাবার উপদেশ তিতা মনে হলেও তা জীবনের শ্রেষ্ঠ ঔষধ।”
৫৮. “মায়ের দোয়া হলো ভাগ্যের চাবিকাঠি।”
৫৯. “মা-বাবা ছাড়া এই পৃথিবী মরুভূমির মতো শুষ্ক।”
৬০. “মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া মানে মানবতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া।”
নীতিবাক্য ও নীতিবিদ্যা থেকে নেওয়া বাণী
৬১. “পরিশ্রমী বাবার হাত হলো সাফল্যের চাবিকাঠি।”
৬২. “মায়ের ধৈর্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাঠশালা।”
৬৩. “মা-বাবা হলেন সেই বৃক্ষ, যারা আমাদের ফল দিয়ে জীবন বাঁচান।”
৬৪. “যাদের মা-বাবা নেই, তারা জানে এক ফোঁটা মমতার দাম কত।”
৬৫. “মায়ের ঋণ কখনো শোধ করা সম্ভব নয়।”
৬৬. “বাবাকে সম্মান করো, তোমার সম্মান সমাজে বৃদ্ধি পাবে।”
৬৭. “মায়ের পায়ের ধুলো কপালে মাখা ভাগ্যের ব্যাপার।”
৬৮. “মা-বাবার দোয়া ছাড়া কোনো কাজই সফল হয় না।”
৬৯. “পিতার আদর্শই সন্তানের চরিত্র গঠন করে।”
৭০. “মায়ের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস ঘর থেকে বরকত কেড়ে নেয়।”
ধর্মীয় দর্শন ও অন্যান্য বাণী
৭১. শ্রী রামকৃষ্ণ: “মাতৃভক্তিই মানুষকে আধ্যাত্মিক পূর্ণতা দান করে।”
৭২. ** গৌতম বুদ্ধ:** “মা-বাবার সেবা করা হলো পরম কল্যাণ।”
৭৩. “মায়ের কথা শোনা মানে ঈশ্বরের কথা শোনা।”
৭৪. “পিতা ধর্ম, পিতা স্বর্গ, পিতাহি পরমন্তপ।”
৭৫. “মাতৃ দেব ভব, পিতৃ দেব ভব।” (উপনিষদ)
৭৬. “পিতা হলেন গৃহের স্তম্ভ, আর মা হলেন গৃহের আত্মা।”
৭৭. “যাদের মা-বাবা খুশি, তাদের ওপর বিধাতা খুশি।”
৭৮. “মায়ের মমতায় কোনো ভেদাভেদ নেই।”
৭৯. “বাবার আশীর্বাদ বিপদ থেকে রক্ষা করে।”
৮০. “মা-বাবার অবাধ্য হওয়া মানে নিজ হাতে কপাল পোড়ানো।”
বিবিধ ও আধুনিক চিন্তাধারা
৮১. “স্মার্টফোন নয়, মা-বাবাকে সময় দিন।”
৮২. “পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মা-বাবার ভালোবাসা।”
৮৩. “যতই ব্যস্ত থাকো, দিনে একবার হলেও মায়ের কণ্ঠ শোনো।”
৮৪. “বাবার ত্যাগের প্রতি সম্মান জানানোই প্রকৃত শিক্ষা।”
৮৫. “মায়ের চেয়ে বড় যোদ্ধা এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই।”
৮৬. “বাবার নীরবতা অনেক বড় শিক্ষার বার্তা দেয়।”
৮৭. “মা-বাবার আশীর্বাদ ছাড়া সাফল্য মূল্যহীন।”
৮৮. “মায়ের আচল হলো সমস্ত ঝড়ের আশ্রয়স্থল।”
৮৯. “বাবার কঠোরতা আসলে সন্তানের জন্য ঢাল।”
৯০. “মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা কোনো বিশেষ দিনের জন্য নয়, প্রতিদিনের জন্য।”
৯১. “যাদের বাবা নেই, তারা মাথার ওপর আকাশ হারিয়েছে।”
৯২. “মায়ের আদর ছাড়া শৈশব অপূর্ণ।”
৯৩. “বাবা হলেন পরিবারের মেরুদণ্ড।”
৯৪. “মা-বাবাকে ভালো রাখা মানে পৃথিবীকে সুন্দর রাখা।”
৯৫. “মায়ের অভাব কোনো কিছু দিয়ে পূরণ করা যায় না।”
৯৬. “বাবার স্বপ্ন পূরণ করাই সন্তানের প্রথম কাজ।”
৯৭. “মা-বাবার কাছে সন্তান সবসময় শিশুই থাকে।”
৯৮. “তাদের বার্ধক্য যেন আমাদের বিরক্তির কারণ না হয়।”
৯৯. “মা-বাবা হলো স্রষ্টার দেওয়া শ্রেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ উপহার।”
১০০. “ভালো সন্তান সেই, যে তার মা-বাবাকে শ্রেষ্ঠ বন্ধুর মতো সম্মান করে।”
মা-বাবার সাথে আচরণের শিষ্টাচার
মা-বাবা যখন বৃদ্ধ হন, তখন তাঁরা অনেকটা শিশুর মতো হয়ে যান। এই সময় তাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় ভালোবাসা এবং সঙ্গ। তাঁদের সাথে কথা বলার সময় অত্যন্ত বিনয়ী হওয়া উচিত। এমনকি তাঁরা যদি ভুল কিছু বলেন বা অন্যায্য দাবি করেন, তবুও তাঁদের সাথে কর্কশ ভাষায় কথা বলা নিষিদ্ধ। আমাদের উচিত তাঁদের চোখের ভাষা বোঝা এবং তাঁদের প্রতিটি ছোটখাটো ইচ্ছাকে সম্মান জানানো। আধুনিক যুগে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া আমাদের সমাজের জন্য একটি কলঙ্ক। সন্তান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব মা-বাবাকে নিজের কাছে রাখা এবং তাঁদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেবা করা।
মা-বাবার প্রতি প্রধান দায়িত্বসমূহ ও সেবার ধরণ
মা-বাবার প্রতি আমাদের দায়িত্বগুলো বহুমুখী। নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে প্রধান দায়িত্বগুলো তুলে ধরা হলো:
| দায়িত্বের ধরন | বিস্তারিত বিবরণ |
| আর্থিক দায়িত্ব | তাঁদের ভরণপোষণ, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় সব খরচ মেটানো। |
| মানসিক সাপোর্ট | তাঁদের সাথে পর্যাপ্ত সময় কাটানো এবং মন খুলে কথা বলা। |
| সম্মান প্রদর্শন | জনসম্মুখে বা একান্তে তাঁদের সাথে নিচু স্বরে ও বিনয়ের সাথে কথা বলা। |
| স্বাস্থ্যসেবা | অসুস্থতায় ব্যক্তিগতভাবে সেবা করা এবং নিয়মিত চেকআপ করানো। |
| পরামর্শ গ্রহণ | জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামত বা অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়া। |
| মৃতু্য পরবর্তী দায়িত্ব | তাঁদের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করা এবং তাঁদের ঋণ পরিশোধ করা। |
বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার একাকীত্ব ও আমাদের করণীয়
মানুষ যখন বৃদ্ধ হয়, তখন তার শারীরিক শক্তির চেয়ে মানসিক শক্তির বেশি প্রয়োজন হয়। এই বয়সে একাকীত্ব তাঁদের সবচেয়ে বড় শত্রু। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তান বিদেশে বা অন্য শহরে চাকরিতে ব্যস্ত থাকায় মা-বাবা বাড়িতে একা পড়ে থাকেন। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা হয়তো ফোনে কথা বলি, কিন্তু সরাসরি সান্নিধ্যের অভাব মেটানো সম্ভব নয়। আমাদের উচিত নিয়মিত বিরতিতে তাঁদের দেখতে যাওয়া এবং তাঁদের পছন্দের খাবার বা উপহার নিয়ে উপস্থিত হওয়া। মনে রাখতে হবে, আপনার দেওয়া দামি স্মার্টফোন বা এসি রুমের চেয়ে আপনার সাথে কাটানো ১০ মিনিটের গল্প তাঁদের কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মা-বাবার অধিকার
ইসলামে মা-বাবার অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকারী কে?” তিনি তিনবার বলেছিলেন, “তোমার মা”, এবং চতুর্থবার বলেছিলেন, “তোমার বাবা।” পবিত্র কুরআনের সূরা বনী ইসরাঈলে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে, মা-বাবা যখন বৃদ্ধ হবেন, তখন তাঁদের যেন ‘উফ’ শব্দটিও না বলা হয়। এটি নির্দেশ করে যে, তাঁদের প্রতি কতটা যত্নশীল ও ধৈর্যশীল হতে হবে। এমনকি মা-বাবা যদি ভিন্নধর্মীও হন, তবুও তাঁদের পার্থিব সেবা করা সন্তানের ওপর ওয়াজিব বা আবশ্যক।
হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মে মা-বাবার মর্যাদা
সনাতন ধর্মে মা-বাবাকে প্রত্যক্ষ দেবতা হিসেবে গণ্য করা হয়। শ্রীরামচন্দ্র তাঁর পিতার আজ্ঞা পালনের জন্য রাজ্য ত্যাগ করে ১৪ বছর বনবাসে গিয়েছিলেন, যা পিতৃভক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বৌদ্ধ ধর্মেও মা-বাবার সেবাকে নির্বাণ লাভের পথ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। খ্রিষ্টধর্মে দশটি আজ্ঞার (Ten Commandments) মধ্যে অন্যতম হলো মা-বাবাকে সম্মান করা। জগতের প্রতিটি আদর্শই আমাদের শেখায় যে, যারা আমাদের জন্ম দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই মানুষের প্রধান ধর্ম।
মা-বাবার জন্য দোয়া এবং ক্ষমা প্রার্থনা
মা-বাবা দুনিয়াতে থাকা অবস্থায় যেমন সেবা করা জরুরি, তাঁরা চলে যাওয়ার পরেও তাঁদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাঁদের জন্য নিয়মিত দোয়া করা আবশ্যক। কুরআনের সেই বিখ্যাত দোয়া— “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগীরা” (হে আমার প্রতিপালক, আপনি তাঁদের ওপর তেমন দয়া করুন যেমনটা তাঁরা আমাকে ছোটবেলায় লালন-পালন করেছিলেন)—আমাদের প্রতিদিন পাঠ করা উচিত। এছাড়া তাঁদের পক্ষ থেকে দান-সদকা করা এবং তাঁদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও সন্তানের অন্যতম দায়িত্ব।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, মা-বাবা হলো আমাদের জন্য জান্নাতের দরজা। তাঁদের দোয়া আমাদের জীবনের কঠিন পথকে সহজ করে দেয়। আমাদের বর্তমান সাফল্য, শিক্ষা এবং অবস্থান—সবকিছুর পেছনে তাঁদের ত্যাগ লুকিয়ে আছে। তাই জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও তাঁদের সময় দিন, তাঁদের ভালোবাসুন এবং তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, আজ আপনি যেমন আচরণ আপনার মা-বাবার সাথে করবেন, ভবিষ্যতে আপনার সন্তানও আপনার সাথে ঠিক তেমন আচরণই করবে। মা-বাবার সেবার মাধ্যমেই ইহকাল ও পরকালে শান্তি লাভ সম্ভব।
FAQs
Q1: মা-বাবার প্রতি সন্তানের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কোনটি?
তাঁদের সাথে সবসময় বিনয়ী ও সুন্দর আচরণ করা এবং তাঁদের বৃদ্ধ বয়সে ব্যক্তিগতভাবে সেবা ও সময় দেওয়া।
Q2: মা-বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁদের জন্য কী করা উচিত?
তাঁদের জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাঁদের নামে সদকা করা এবং তাঁদের অসিয়ত বা ঋণ থাকলে তা দ্রুত পূরণ করা।
Q3: যদি মা-বাবা অন্যায় আদেশ করেন তবে কী করণীয়?
যদি তাঁরা এমন কিছু করতে বলেন যা সৃষ্টিকর্তার আদেশের বিরোধী, তবে তা বিনয়ের সাথে এড়িয়ে যেতে হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদের প্রতি অসম্মান করা যাবে না।
Q4: মা-বাবার মধ্যে কার অধিকার বেশি?
ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মায়ের অধিকার বাবার চেয়ে তিন গুণ বেশি, তবে উভয়েই সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী।
Q5: কর্মব্যস্ততার কারণে মা-বাবাকে সময় দিতে না পারলে কী করবেন?
প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও ফোনে তাঁদের খোঁজ নেওয়া এবং ছুটির দিনগুলোতে তাঁদের সাথে গুণগত সময় কাটানোর চেষ্টা করা।
Q6: মা-বাবার অবাধ্য হওয়ার পরিণাম কী?
মা-বাবার অবাধ্য হওয়া বড় পাপের শামিল, যা ইহকালে অশান্তি এবং পরকালে শাস্তির কারণ হতে পারে।
Q7: মা-বাবার দোয়া কি সত্যিই ভাগ্য পরিবর্তন করে?
হ্যাঁ, প্রচলিত বিশ্বাস এবং ধর্মীয় শিক্ষা অনুযায়ী মা-বাবার দোয়া সরাসরি কবুল হয় এবং এটি সন্তানের জীবনের বরকত ও উন্নতি নিয়ে আসে।
Somoy Media All Time Information